একটি জাতিরাষ্ট্র কখন, কেন ব্যর্থ হয়

একটি জাতিরাষ্ট্র কখন, কেন ব্যর্থ হয়

ব্যর্থ রাষ্ট্রের পথে বাংলাদেশ?

রাষ্ট্র যখন তার নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারে না এবং ন্যূনতম ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অক্ষম হয়ে পড়ে—তখন তাকে আর পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র বলা যায় না। মার্কিন চিন্তাবিদ রবার্ট রটবার্গ বহু আগেই এই বাস্তবতা তুলে ধরেছিলেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকের বাংলাদেশ সেই ব্যর্থতার দিকেই এগোচ্ছে।

সম্প্রতি সংঘটিত একের পর এক ঘটনা এই আশঙ্কাকে আরও দৃঢ় করেছে। শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পরও অপরাধীদের গ্রেপ্তার না হওয়া, সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে জোরপূর্বক পদত্যাগ চাপিয়ে দেওয়া এবং মব সহিংসতায় একজন শ্রমিককে নির্মমভাবে হত্যা—এসবই প্রমাণ করে রাষ্ট্র তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনার পর দায়িত্বশীল কারও জবাবদিহি নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেবল আনুষ্ঠানিক দুঃখপ্রকাশ আসে, কিন্তু ব্যর্থতার দায় কেউ নেয় না। বিশ্বে এমন নজির আছে, যেখানে বড় দুর্ঘটনা বা নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় নিয়ে মন্ত্রী কিংবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেছেন। বাংলাদেশে সে সংস্কৃতি অনুপস্থিত।

এ পরিস্থিতিতে সহিংসতা যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। মবতন্ত্র সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে, আর রাষ্ট্র নির্বিকার দর্শকের ভূমিকায়। এই নীরবতা অপরাধকে উৎসাহিত করছে এবং নাগরিকদের মনে নিরাপত্তাহীনতা বাড়াচ্ছে।

আরও উদ্বেগের বিষয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত এই অরাজকতার বাইরে নয়। শিক্ষককে রাজনৈতিক পরিচয়ের অজুহাতে পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে, অথচ প্রশাসন নীরব। এটি কেবল শিক্ষাঙ্গনের নয়, পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।

রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে তার পরিণতি কী হতে পারে—হাইতি, সোমালিয়া কিংবা সুদানের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। বাংলাদেশও সেই পথে এগোচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন এখন আর অমূলক নয়।

তবে এই পতন অনিবার্য নয়। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এখনো নাগরিকদের হাতেই। প্রয়োজন ন্যূনতম নৈতিক ঐকমত্য, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব। এ মুহূর্তে সংবাদমাধ্যমই একমাত্র কার্যকর নজরদারির ভূমিকা পালন করছে। আদালত, প্রশাসন ও রাজনৈতিক কাঠামো যখন নীরব, তখন গণমাধ্যমকেই সত্য তুলে ধরতে হবে।

এক শতাব্দী আগে জোসেফ পুলিৎজার বলেছিলেন—একটি দেশের গণতন্ত্র নির্ভর করে তার সংবাদমাধ্যমের সততা ও সাহসের ওপর। আজ সেই কথাই আবার সত্য হয়ে উঠছে।

প্রশ্ন একটাই—আমরা কি এই ব্যর্থতার পথ মেনে নেব, নাকি এখনই ঘুরে দাঁড়াব?

সর্বশেষ সংবাদ