খ্রিষ্টানদের ওপর হামলা ও বড়দিনের ছুটি বাতিল: ভারত সরকারের নীরবতার অর্থ কী?

খ্রিষ্টানদের ওপর হামলা ও বড়দিনের ছুটি বাতিল: ভারত সরকারের নীরবতার অর্থ কী?

বড়দিনের ছুটি বাতিল: ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কোণঠাসা করার আরেকটি ইঙ্গিত

বড়দিনের ছুটি বাতিল নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। কেরালার লোক ভবনে বড়দিনে ছুটি বাতিল করে কর্মীদের ‘সুশাসন দিবস’ কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাটি দেশজুড়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি আরও বিতর্কিত হয়েছে, কারণ একই প্রতিষ্ঠানের ক্যালেন্ডারে ভি ডি সাভারকারের প্রতিকৃতি সংযোজন করা হয়েছে, যা অনেকের কাছে একটি আদর্শিক চাপ প্রয়োগের ইঙ্গিত।

কেরালার মতো ধর্মীয় সম্প্রীতির রাজ্যে বড়দিনে বাধ্যতামূলক কর্মসূচি আরোপকে অনেকেই নিরপেক্ষ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। বিশেষত যেখানে খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী, সেখানে এমন সিদ্ধান্ত গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এই প্রবণতা শুধু কেরালাতেই সীমাবদ্ধ নয়। উত্তর প্রদেশেও বড়দিনে স্কুল খোলা রাখা ও শিক্ষার্থীদের অটল বিহারি বাজপেয়ীর জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খ্রিষ্টান সংগঠনগুলোর মতে, এটি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার পরিপন্থী এবং সংখ্যালঘুদের কোণঠাসা করারই অংশ।

পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। ‘ইভানজেলিক্যাল ফেলোশিপ অব ইন্ডিয়া’-র তথ্যমতে, ২০২৩ সালে খ্রিষ্টানদের ওপর সহিংসতার ঘটনা ছিল ৬০১টি, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৮৩০টিতে—গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এসব হামলার মধ্যে রয়েছে গির্জা ভাঙচুর, প্রার্থনায় বাধা, যাজকদের ওপর হামলা এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরের মিথ্যা অভিযোগ।

সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে উত্তর প্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান ও হরিয়ানায়—যেখানে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা কিংবা প্রত্যক্ষ সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। ছত্তিশগড়ের ধামতরি জেলায় প্রার্থনাকালে গির্জায় হামলা, বাইবেল পোড়ানো ও যাজকদের মারধরের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। একইভাবে ওডিশা ও মধ্যপ্রদেশেও যাজক ও ধর্মযাজিকাদের ওপর হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্মান্তরবিরোধী আইনগুলো বাস্তবে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বদলে হয়রানির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এসব আইনের অপব্যবহার করে উগ্র গোষ্ঠীগুলো আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে, আর প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রেই নীরব ভূমিকা পালন করছে।

এই পরিস্থিতি কেবল শারীরিক সহিংসতায় সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিকভাবে খ্রিষ্টানদের একঘরে করে দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। বিভিন্ন জায়গায় বড়দিনের অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য করা হচ্ছে, এমনকি কিছু সংগঠন খোলাখুলি হিন্দুদের বড়দিন পালন না করার আহ্বান জানাচ্ছে।

এই বাস্তবতা ভারতের বহুত্ববাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধান যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দেয়, সেখানে বাস্তবে সেই অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

কেরালার লোক ভবনে বড়দিনের ছুটি বাতিলের ঘটনা আসলে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতিফলন—যেখানে রাষ্ট্রীয় পরিসর ধীরে ধীরে সংখ্যাগুরু আদর্শের অধীনে সাজানো হচ্ছে এবং সংখ্যালঘুদের উপস্থিতিকে অস্বস্তিকর হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই প্রবণতা থামাতে হলে শুধু নিন্দা নয়, প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম। নচেৎ, ভারতের গণতন্ত্র তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হবে—আর সেটিই হবে সবচেয়ে বড় সংকট।

সর্বশেষ সংবাদ